বুকে ছিল একরাশ যন্ত্রণা। পিতৃ বিয়োগের যন্ত্রণা। সেই কষ্টের বহিঃপ্রকাশ ঘটল ব্রিস্টলের বাইশ গজে। প্রথম ইনিংসে ১৩১ রানে ৪ উইকেট নেওয়ার পর ফলো অনের পর দ্বিতীয় ইনিংসে ম্যাচ বাঁচানো ৮০ রানে অপরাজিত থেকে ভারতকে হার থেকে বাঁচালেন। একেবারে রাজকীয় টেস্ট অভিষেক। এমন কীর্তির জন্য দেহরাদুনের স্নেহ রানার নামটা সবাই জেনে ফেলেছেন। এমন একটি মেয়ে যার জীবনে স্বজন হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গে রয়েছে প্রতি পদক্ষেপে শুধু লড়াই আর লড়াই।
২৭ বছরের অলরাউন্ডারের ক্রিকেটীয় উত্থান এত সহজ ছিল না। ঝুলন গোস্বামী, হরমনপ্রীত কৌরদের মতো স্নেহকেও অনেক ঝড়ঝাপ্টা সহ্য করতে হয়। বাবা ভগবান সিংহ রানা এলাকার দাপুটে রাজনীতিবিদ ছিলেন। এহেন ভগবান সিংহ কিন্তু শুরুর দিকে স্নেহর ক্রিকেট প্রেমকে ভাল চোখে দেখেননি। তাই তো মধ্যবিত্ত পরিবারে আর্থিক কষ্ট না থাকলেও ব্যাট, প্যাড কেনার জন্য সাহায্য পাননি। যদিও তাঁকে আটকে রাখতে পারেননি দুই মাস আগে প্রয়াত হওয়া ভগবান সিংহ।
মেয়ে হয়ে জন্মালেও এলাকা ও এলাকার বাইরে ছেলেদের সঙ্গে খেলতে পছন্দ করতেন স্নেহ। তখন ওঁর বয়স বড়জোর ১২ কি ১৩। সবার মতো টেনিস বল দিয়ে শুরু হল হাতেখড়ি। ব্যাট-বলে দাপট দেখানোর জন্য কয়েক মাসের মধ্যেই দেহরাদুনের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ল। শুরু হল টেনিস বলে ‘খেপ’ খেলা। বাবা-মা’র বকাঝকা হজম করেও একের পর এক রাতে টেনিস বলের প্রতিযোগিতা খেলতে লাগলেন স্নেহ। কিন্তু ওঁর আশ মিটছিল না। কম বয়সেই বুঝে গিয়েছিলেন টেনিস বলে খেলে এলাকায় পরিচিত পেলেও সেটা যথেষ্ট নয়।
কপালও সঙ্গ দিল। টেনিস বলে ওঁকে খেলতে দেখে দেহরাদুনের ‘লিটল মাস্টার ক্রিকেট অ্যাকাডেমি’তেও সুযোগ দেওয়া হল। প্রশিক্ষক কিরণ শাহের কাছে শুরু হল ডিউস বলে ক্রিকেট পাঠ। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে সেখানেও সবাইকে ছাপিয়ে গেলেন স্নেহ। তখন ওঁর বয়স মাত্র ১৪। সেই সময় উত্তরাখণ্ডের কোনও ক্রিকেট সংস্থা ছিল না। কিন্তু প্রথম প্রশিক্ষক কিরণ শাহ তাঁর ছাত্রীকে আটকে রাখতে রাজি নন। তাই স্নেহকে পাশের রাজ্য হরিয়ানাতে পাঠিয়ে দেওয়া হল।
কেমন ছিল সেই দিনগুলো? কোচ কিরণ শাহ বলছিলেন, “একদিকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় পাশ করার জন্য ওকে পরিবার থেকে চাপ দেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে হরিয়ানার রাজ্য মহিলা দলের ক্যাম্পে চলছে তীব্র স্বজনপোষণ। অন্য রাজ্য থেকে আসার জন্য হরিয়ানার কয়েক জন ওকে পাত্তা দিত না। মেয়েটা হস্টেলের ঘরে বসে শুধু কান্নাকাটি করত। তবে খুব বেশিদিন ওকে সেখানে কাঁদতে হয়নি। আমার এক আত্মীয় পঞ্জাবের অমৃতসরের বিবিকে ডিএভি কলেজে ক্রীড়া প্রশিক্ষক ছিল। ওঁর সৌজন্যে সেই কলেজের মহিলা দলে অনুশীলন করার সুযোগ পেয়েছিল স্নেহ। তারপর আর ওকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।”