
Sign up to save your podcasts
Or


সত্যবদ্ধ অভিমান
-সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?
শেষ বিকেলের সেই ঝুল বারান্দায়
তার মুখে পড়েছিল দুর্দান্ত সাহসী এক আলো
যেন এক টেলিগ্রাম, মুহূর্তে উন্মুক্ত করে
নীরার সুষমা
চোখে ও ভুরুতে মেশা হাসি, নাকি অভ্রবিন্দু?
তখন সে যুবতীকে খুকি বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়—
আমি ডান হাত তুলি, পুরুষ পাঞ্জার দিকে
মনে মনে বলি,
যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো—
ছুঁয়ে দিই নীরার চিবুক
এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ
আমি কি এ হাতে আর কোনোদিন
পাপ করতে পারি?
এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি—
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে পড়ে ভীষণ জরুরী
কথাটাই বলা হয়নি
লঘু মরালীর মতো নারীটিকে নিয়ে যাবে বিদেশী বাতাস
আকস্মিক ভূমিকম্পে ভেঙে যাবে সবগুলো সিঁড়ি
থমকে দাঁড়িয়ে আমি নীরার চোখের দিকে…
ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ
সত্যবদ্ধ অভিমান—চোখ জ্বালা করে ওঠে,
সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে
এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি
এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?
দ্বিতীয় সংসার"
~ জয় গোস্বামী।
তার সঙ্গে সংসার করেছি কতদিন-
তিন-চার ঘণ্টার সংসার।
স্বামীকে বিচ্ছেদ দিয়ে
সে থাকত একাই একটা ফ্ল্যাটে—
সেই ফ্ল্যাটে যেতাম।
কলেজে অফ ডে কবে সে জানাত ফোনে,
তার ফোন মানে আসতে বলা।
গেলেই আমার কোনও বই এনে সামনের পৃষ্ঠাটি
খুলে ধরে অনুরোধ: ‘সই করে দিন।’
আমার অবাক লাগত প্রথম প্রথম—
বলেছি: ‘কিনলেন কেন? আমিই তো দিতাম।”
তার উত্তর: ‘আমার ইচ্ছে আমি কিনছি, আপনি বাধা দেওয়ার কে?’
পরক্ষণে গলা পাল্টে: ‘দিন না বাবা একটু সই করে!’
হ্যাঁ আমরা পরস্পরকে আপনিই বলতাম
সারাক্ষণ ‘আপনি’। শুধু ওই সময়টুকু
‘তুমি’ হয়ে যেতাম দু’জন।
যে-সময়ে ঝড় হত। ঝড়ের সময় ‘তুমি’। ঝড়বাদল শেষে আমাকে শয্যায় রেখে, মেঝেতে লুটনো চুড়িদার
তুলে নিয়ে সে যেত স্নানঘরে।
বেরিয়ে জিজ্ঞেস করত: ‘চা খাবেন না কফি?’
ততক্ষণে পোশাক বদল করেছে সে
বলতাম: ‘কফিই করুন।'
আবার ‘আপনি’-তে ফিরে যাওয়া।
কফি শেষ হলে বলত: ‘ভাত চাপিয়েছি—
সঙ্গে সাদা আলুর তরকারি, লঙ্কা দিয়ে,
ডাল আছে, খেতে বসলে মাছ ভেজে দেব।
তাড়াতাড়ি স্নান সেরে আসুন।'
কেমন যেন সংসার-সংসার মনে হত।
এখন সে চলে গেছে। সম্ভবত অন্য কারও কাছে।
আর কোনও যোগাযোগ নেই।
তবুও এখনও যেন মনে মনে শুনতে পাই, শুনি
দ্রুত নিশ্বাসের ফাঁকে ফাঁকে
চাপা স্বরে বলে যাওয়া তার:
‘দাও, দাও এবার।'
আমিও তো উল্কা ঢেলে দিতাম তক্ষুনি।
একদিন বলেছিল: ‘রোজই তো দুপুরে এসে সন্ধেবেলা বাড়ি ফিরে যান।
একটা পুরো রাত্তিরও তো আমাকে দিলেন না আপনি আজও।'
বলেছিল: ‘আমার কী ইচ্ছে করে জানেন? আপনার
কাঁধে মাথা রেখে
বৃষ্টির আওয়াজ শুনব, শুয়ে শুয়ে, অন্ধকার ঘরে।
বিদ্যুৎ চমকাবে জানলায়।”
বলেছিল: ‘থাকবেন আমার সঙ্গে? এই ফ্ল্যাটে?
বলুন, থাকবেন?
মাইনের টাকা আপনি সবটাই বাড়িতে দেবেন
তাতে কোনও অসুবিধে হবে না আমার
কলেজের চাকরি আছে। দু’জনের চলে যাবে ঠিক।’ বলেছিল।
আমারই সাহস হয়নি। পিছিয়ে এসেছিলাম আমি।
তারপরই তো চলে গেল। দশ পনেরো বিশ তিরিশবার
ফোন করে চললাম। আর ফোন ধরল না আমার।
চিঠি লিখলাম কত। একটারও উত্তর এল না।
পাঁচ বছর কেটে গেছে। আরও যাবে পাঁচ দশ বছর।
সে ফিরে আসবে না আর আমার জীবনে। তবু জানি-
তবু জানি লেখার ভেতর
একমাত্র লেখারই ভেতর এসে ঢুকে পড়তে থাকবে বারবার
তার সঙ্গে আমার সেই তিন-চার ঘণ্টার সংসার
প্রত্যেক সপ্তাহে পাওয়া সেই আমার তিন চার ঘণ্টার সংসার ।
একটা তুমির গল্প
— স্বপ্নীল চক্রবর্ত্তী
তুমি বলেছিলে রাতে তোমার ঘুম হয় না,
আমি বুঝেছিলাম সময় চাইছো;
তুমি বলেছিলে "আকাশে কী মেঘ করেছে দেখো?",
আমি বুঝেছিলাম তোমার মন খারাপ।
তুমি বলেছিলে "চুলে জট বেধেছে";
আমি বুঝেছিলাম তুমি স্পর্শ চাইছো।
তুমি বলেছিলে আজ বিকেলে তুমি বারান্দায় থাকবে;
আমি বুঝেছিলাম সাক্ষাত চাও।
তুমি বলেছিলে,অন্ধকারে আমার বড্ড ভয়;
আমি বুঝেছিলাম তোমার আমাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করছে;
তুমি বলেছিলে সমুদ্রে যাবে;
আমি বুঝেছিলাম পাশাপাশি হাত ধরে হাঁটতে চাইছো।
তুমি বলেছিলে নীল প্রিয় রঙ,
আমি বুঝেছিলাম তোমার কষ্ট হচ্ছে;
তুমি বলেছিলে ঠোঁট ফেটেছে,
আমি বুঝেছিলাম চুমু খেতে চাইছো;
তুমি বলেছিলে অংক ভালো লাগেনা,
আমি বুঝেছিলাম তুমি কবিতা ভালোবাসো;
তুমি বলেছিলে " আজ তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে হবে",
তুমি বলেছিলে, এই হুটহাট দেখা করা,অসময়ে ফোন করা আর তোমার ভালোলাগছেনা;
আমি বুঝে গিয়েছিলাম,বিচ্ছেদ চাইছো।
তারপর অলিখিত সাক্ষরে তুমি যখন ইনভিজিবল কোর্টে আমার বিরুদ্ধে বিচ্ছেদের মামলা ঠুকে দিলে;
আমি বুঝেছিলাম তুমি মুক্তি চাও।
এরপর সব বুঝে যখন আমি দার্শনিক,
সব মিটিয়ে তুমি যখন অন্য ঘরের শো-পিস,
একদিন আমাদের দেখা হলো তখন;
তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে,"কেমন আছো?"
আমি বুঝে গিয়েছিলাম তুমি ভালো নেই।
ভিক্ষাপাত্র
সাদিয়া নাজিব
ব্যাকরণের বাইরে একটি প্রেম করবো।
মুঠোফোনে রাত বিরাতে প্রেমের তুমুল টেক্সট আদান প্রদানের নয়।
আমি মতিঝিলের অফিস পাড়া থেকে ঘর্মাক্ত শরীরে
বাসে বাদুড় ঝুলা হয়ে উড়ে উড়ে যাব
মিরপুর দশ নম্বর গোল চক্করের ডান দিকের মোড়ের চায়ের দোকানে
যেখানে তুমি একদিন বসেছিলে!
কাঙাল হয়ে খুঁজবো তোমার ছোঁয়া লাগা সেই বেঞ্চিটি।
আর সব প্রেমিকের মতো, তোমাকে ফুল উপহার দেবো না প্রিয়তমা!
আমার মানিব্যাগে ফুল কেনার পয়সা থাকে না
ঘাসফুল বা বুনো ফুল যে দেবো
তার ও কোনো উপায় নেই
ঢাকা শহরের মাটি- কোথায় যে ঘাস হবে!
আমি নিজ হাতে, সাদা কাগজে মনের রংতুলি দিয়ে এঁকে দেবো পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফুল,
'ভালোবাসা'।
তুমি কি তার ঘ্রাণ নেবে!
ব্যাকরণসিদ্ধ কোনো পথই আমার অনুকূল নয়
আমার বুকে যে বসন্তের রঙ
চোখে যে অপার জলরাশি
তাতে কি তুমি একটি বার ভাসাবে তোমার ভেলা!
এসো না এই রাজভিখারীর কাছে
ভিক্ষাপাত্র পেতে আছি তোমার দুয়ারে!
"মাঝে মাঝে লোডশেডিং"
(হে সময় অশ্বারোহী হও)
– পূর্ণেন্দু পত্রী
মাঝে মাঝে লোডশেডিং হোক।
আকাশে জ্বলুক শুধু ঈশ্বরের সাতকোটি চোখ
বাকী সব আলকাতরা মাখুক।
আমরা নিমগ্ন হয়ে নিজস্ব চশমায় আর দেখি না কিছুই
সকলে যা দেখে তাই দেখি।
আকাশের রঙ তাই হয়ে গেছে চিরকালে নীল।
বাতাস কি শাড়ি পরে কারো জানা নেই।
মাঝে মাঝে লোডশেডিং হোক।
সাদা মোমবাতি জ্বেলে
তোমাকে সম্পূর্ণ করে দেখি।
নারীকে বাহান্ন তীর্থ বলেছে শুনেছি এক কবি।
আমি তার গর্ভগৃহ, সরু সিড়ি, সোনার আসন
চন্দনবটিতে থাকে কতটা চন্দন
দেখে গুনে গুনে মেপে দেখে
তবেই পাতাবো মৌরীফুল।
শেষ প্রেমের কবিতা
-তারাপদ রায়
দেরি হলো,
তোমারো কিছুটা দেরি হলো,
আমারো কিছুটা দেরি হলো,
তা হোক, তুমি তো জানো
এর চেয়ে আরো ছাড়াছাড়ি,
এর চেয়ে আরো দেরি মানুষের হয়।
অতএব যদি পারো
একবার শেষবার এসো।
হাত ধরাধরি করে এসো গান গাই
বসি ওই দীঘির সিঁড়িতে।
এসো স্বপ্ন, রাজহাঁস, বকুলের মালা
এতদিন পরে,
একবার শেষবার এসো।
এক জন্ম
-তারাপদ রায়
অনেকদিন দেখা হবে না ৷
তারপর একদিন দেখা হবে ।
দু'জনেই দু'জনকে বলবো,
‘অনেকদিন দেখা হয়নি ।'
এইভাবে যাবে দিনের পর দিন
বৎসরের পর বৎসর।
তারপর একদিন হয়তো জানা যাবে
হয়তো জানা যাবে না,
যে
তোমার সঙ্গে আমার
অথবা
আমার সঙ্গে তোমার
'আর দেখা হবে না ।
আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে
তারাপদ রায়
আমরা যে গাছটিকে কৃষ্ণচূড়া ভেবেছিলাম,
যার উদ্দেশে ধ্রুপদী বিন্যাসে কয়েক অচ্ছেদ
প্রশস্তি লিখেছিলাম,
গতকাল বলাইবাব, বললেন, 'ঐটি বানরলাঠি গাছ। '
অ্যালসেশিয়ান ভেবে যে সারমেয় শাবকটিকে
আমরা তিনমাস বকলস পরিয়ে মাংস খাওয়ালাম
ক্রমশ তার থে কিভাব প্রকট হয়ে উঠছে।
আমরা টের পাইনি
আমাদের ঝর্ণাকলম করে ডট পেন হয়ে গেছে
আমাদের বড়বাব, কবে হেড অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে গেছেন
আমাদের বাবা কবে বাপি হয়ে গেছেন।
আমরা বুঝতে পারিনি
আমাদের সর্বনাশ হয়ে গেছে।
‘যাই’ বললেই যাওয়া হয় না।
মা বলতেন, ‘যাই নয়, বলো আসি।’
কাল সকালেই ঝিরঝির বৃষ্টির ভিতরে
ওই কথাই আরেকবার লিখেছি।
একদিন পরে এখন মনে হচ্ছে,
‘আসি’ বললেই কি আসা হয় !
‘আসি-আসি’ করে কতবার যে
চৌকাঠ পর্যন্ত এসে আটকিয়ে গেছি।
‘যাই-যাই’ করেও কোথাও যাওয়া হয়নি।
দিনের পর দিন এসেছে, গিয়েছে।
আমার আসা যাওয়ার দিন শেষ,
এখন শুধু ঝিরঝির বৃষ্টি ভেতরে...
এটাই সত্যি, এটাই প্রাপ্তি
অঙ্গন দাস
পৃথিবীতে যত কলম আছে
তত আগ্নেয়াস্ত্র নেই।
পৃথিবীতে যত মানুষ কলম ধরবার জন্য জন্মেছে এবং জন্মাবে,
আগ্নেয়াস্ত্র ধরবার জন্য তত মানুষ আগেও জন্মায়নি, আর
জন্মাবে না কখনও।
এটাই সত্যি, এটাই প্রাপ্তি পৃথিবীর।
উচ্চারণ - অরিজিৎ বনিক
From the publisher's feed

0 Listeners