
Sign up to save your podcasts
Or


কখনও শ্রীরঙ্গমের রঙ্গানাথাস্বামী মন্দিরে গেলে দেখবেন সেখানের বিষ্ণুমূর্তিকে রুটি, মিষ্টি ও ঘি ভোগ হিসাবে দেওয়া হচ্ছে। এই বিগ্রহকে রঙিন লুঙ্গির মতো কটিবস্ত্র পরানো। এই দুটো ঘটনাই কিন্তু বেশ অস্বাভাবিক। কেন? ভারতের প্রায় সবকটি বিষ্ণু, নারায়ণ বা কৃষ্ণের মন্দিরে প্রাচীনতা বজায় রেখে অন্নভোগ বা ফলভোগ দেওয়া হয়। কোথাও খিচুড়ি বা কোথাও পায়েস বা পায়েসম্। প্রাচীনকাল থেকে বেশিরভাগ হিন্দু মন্দিরগুলোতে মূলত অন্নভোগ দেওয়াই রীতি ছিল। দক্ষিণের প্রায় সবকটি বিষ্ণু মন্দিরেই বিগ্রহকে কটিবস্ত্র হিসাবে সাদা ধুতি পরানোই রীতি। তাহলে এই মন্দিরে এরকম রীতি কেন? রাধাকৃষ্ণের প্রেমের অনন্য প্রেমকাহিনি আমাদের সবার জানা। মীরার আর কৃষ্ণের প্রেমকাহিনিও হয়তো আমরা জানি। কিন্তু একজন সুলতানা আর কৃষ্ণের প্রেমের কাহিনি? ভ্যালেন্টাইনস্ উইকে আজ থাকছে তেমনই এক প্রেমের গল্প।
সে গল্প বলতে গেলে ভারতের মধ্যযুগের এক অন্ধকারময় সময়ে যেতে হবে। এই গল্পের অনেকগুলো রূপভেদ আছে যদিও মূল নির্যাস একই। এই ঘটনার উল্লেখ মূলত পাওয়া যায় তামিল গ্রন্থ ‘কোইল ওজগু’ (Koil Ozhugu) থেকে। তেরোদশ শতকের ভারতবর্ষ। ভারতের দক্ষিণের ধনশালী মন্দিরগুলোর দিকে নজর পড়েছে দিল্লির মসনদে থাকা সুলতান আলাউদ্দিন খিলজীর। তাঁর বিভিন্ন সেনাপ্রধানরা দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে আক্রমণ করে বিভিন্ন মন্দির লুট করে ধনসম্পদ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে। সেই একই সময়ে বাদশার অন্যতম সেনাপ্রধান মালিক কাফুর দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে একই বাসনা নিয়ে আক্রমণ করেন। শ্রীরঙ্গমের মন্দিরটি রক্ষা করতে তিনদিন বৈষ্ণব ভক্তরা লড়াই করেও পরাস্ত হন। মালিক কাফুরের সেনা মন্দিরের সোনাদানাসহ মন্দিরের মূল ধাতব মূর্তিও লুট করে দিল্লির দিকে ফিরে চলে। এই পুরো লম্বা যাত্রার সময়ে একজন মহিলা বৈষ্ণব ভক্ত সুলতানের সৈন্যকে গোপনে অনুসরণ করে দিল্লিতে গিয়ে পৌঁছায়। সেই মহিলা লুকিয়ে সুলতানের মহলে ঢুকে দেখতে পায় তাদের প্রিয় মূর্তিটি একটা ঘরে আরও অনেক জিনিসের সঙ্গে জমা পড়েছে। অন্যান্য মূল্যবান ধাতুর মতোই হয়তো খুব তাড়াতাড়ি মূর্তিটিও গলিয়ে ফেলা হবে। কোইল ওজগু গ্রন্থে এই মহিলাকে বলা হয়েছে ‘পিন থোডার্নডা ভাল্লি’, অর্থাৎ যে নারী অনুসরণ করেছিলেন।
সেই ‘পিন থোডার্নডা ভাল্লি’ মালিক কাফুরের মহলে অল্প কিছুদিন লুকিয়ে এক অদ্ভুত ব্যাপার দেখেন। মালিক কাফুরের কন্যা, সম্ভবত নাম সুরাতানি পিতার কাছে এই মূর্তিটি উপহার হিসাবে দাবি করেন। মালিক কাফুর তাঁর কন্যাকে এই মূর্তিটি দিয়ে দিলে, তাঁর কন্যা খেলার ছলেই পোষাক পরিয়ে ভোগ নিবেদন করে খেলতে থাকেন। এই গল্পের অন্য একটি রূপভেদে বলা হয়, এই রাজকন্যা দিল্লির বাদশার কন্যা ছিলেন। তিনি এই মূর্তিকে ভোগ হিসাবে রুটি ও ঘি-ই পরিবেশ করতেন, পোষাক হিসাবে উজ্জ্বল রঙিন কটিবস্ত্র পরাতেন। সুরাতানি হিন্দু পূজার রীতিনীতির কিছুই না জেনেও নিজের মতো করে সর্বক্ষণের জন্য মূর্তিটির সেবা করতেন। এমন কী তিনি রাতে এই মূর্তিটি নিয়ে একই বিছানায় শুতে যেতেন। বেশ কিছু গল্পে বলা হয়, ‘রঙ্গানাথাস্বামী’ নাকি রাতে নিভৃতে মানুষের রূপে সুরাতানির কাছে ধরা দিতেন।
‘পিন থোডার্নডা ভাল্লি’ শ্রীরঙ্গমে ফিরে সেখানের পুরোহিতদের জানান যে তাদের মূর্তি তখনও সুলতানের ঘরে অক্ষত রয়েছে আর তাদের উচিত মূর্তিটিকে মন্দিরে ফিরিয়ে আনা। সেই মতোই মন্দিরের পুরোহিত, গীতিকার, নৃত্যশিল্পী প্রভৃতিরা মালিক কাফুরের রাজসভায় গিয়ে তাঁর মনোরঞ্জনের জন্য নৃত্য-গীতি পরিবেশন করেন। মালিক কাফুর খুশি হয়ে তাদের কিছু দিতে চাইলে, তারা ‘রঙ্গানাথাস্বামী’র মূর্তিটি ফেরত নিয়ে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থনা করে। মালিক কাফুর এতে রাজি হলেও তাঁর কন্যা রাজি হন না। তাই সুরাতানি রাতে ঘুমিয়ে পড়লে দলটি এই মূর্তিটি চুরি করে পালিয়ে যায়। এই চুরির জন্য যদি সুলতানের সৈন্য আবার পিছু নেয়, এই ভয়েই তারা ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে নানাদিকে যাত্রা করে। একটি পরিবারের তিন প্রজন্মের তিনজন পুরুষের কাঁধে ভার পড়েছিল এই মূর্তিটি বনের পথে শ্রীরঙ্গমে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার। কিন্তু এই তিনজনেই ঘন জঙ্গলে পথ হারায়, কিছুদিন পরে দুজন সদস্য মারা যায়। একজনের পক্ষে আর ভারি মূর্তি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হল না।
ওদিকে ঘুম থেকে উঠেই সুরাতানি মূর্তিটি দেখতে না পেয়ে ঘোড়ায় করে একাই শ্রীরঙ্গমের দিকে যাত্রা করলেন। তারপর?
স্ক্রিপ্ট- কৌশিক রায়, কণ্ঠ- শঙ্খ বিশ্বাস, সাউন্ড ডিজাইন- শঙ্খ বিশ্বাস,কভার- রৌনক
আমরা যে শকুন্তলার কাহিনি জানি, তা কি আদৌ সত্যি? চিরাচরিত শোনা গল্পের পিছনে কি আছে অন্য এক শকুন্তলার গল্প? শুনতে হলে কান রাখুন আমাদের এই পর্বে। কালিদাসের শকুন্তলা আর মহাভারতের শকুন্তলা কি আলাদা? শুনতে থাকুন এই পর্বে।
প্রেমের মরসুমে শুনুন এক নতুন প্রেম কাহিনি!
কণ্ঠ -শঙ্খ বিশ্বাস
স্ক্রিপ্ট- কৌশিক রায়
সাউন্ড ডিজাউন- শঙ্খ বিশ্বাস,
শঙ্খদা হাতের বইটা নামিয়ে রেখে চেয়ারে আরাম করে বসে, “আচ্ছা বলতো পশ্চিমবাংলার রাজধানীর নাম কী?”
“এই নিয়ে পড়াশোনার কী আছে এত? কলকাতা।” আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি।
“আর বাংলাদেশের?”
“ঢাকা” এবারে বল্টু উত্তর দেয়।
“হুম। এবারে ভাব,স্বাধীনতার আগে একটাই বাংলা ছিল তখন তার রাজধানী কী ছিল?”
এবারে বল্টু আর আমি দুজনে দুজনের মুখের দিকে তাকিয়ে হাঁ করে রইলাম। একটা প্রশ্ন বটে। কিন্তু এর উত্তর যে জানা নেই।”
বল্টু বলল, “তুমিই বলো। আমরা শুনি।”
.
.
“একজন রাজপুত সেনানায়ক উড়িষ্যা জয় করে রাজমহলে এসে প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করেন। একই সঙ্গে একটি মন্দির নির্মান শুরু করেন। বিহারের তৎকালীন সুবেদার বা শাসক ছিলেন ফতেজঙ্গ খাঁ। তিনি অনেকদিন ধরেই বিদ্রোহের সুযোগ খুঁজছিলেন। তা এই খাঁ মশাই মোগল দরবারে এক্কেবারে মানসিংহের নামেই মামলা করে বসলেন। তিনি লিখে পাঠালেন, মানসিংহের প্ররোচনায় নগরের মাঝে হিন্দু মন্দির তৈরি করে নগরের পবিত্রতা নষ্ট করা হচ্ছে। এই শুনে মানসিংহ পড়লেন সমস্যায়। আকবর হয়তো মানসিংহকে একটু ধমকও দিলেন, ‘একই কথা শুনি হায়/জাত-কুল মান সব যায়!’ মানসিংহ বললেন, ‘মানসিং হেয়ার, নো ফিয়ার!’। তিনি রাতারাতি রাজমহলের নাম বদলে আকবরনগর করে দিলেন আর হিন্দু মন্দিরের স্থানে জুম্মা মসজিদে পরিবর্তন করে দিলেন।”
বল্টু বলে, “মাঝে জাহাঙ্গীরনগর রাজধানী যাওয়ার গল্পটা বলো?”
.
.
স্ক্রিপ্ট-কৌশিক রায়। পর্বপাঠ- শঙ্খবিশ্বাস | সাউন্ড ডিজাইন- শঙ্খ বিশ্বাস।
পিকাই চুপচাপ বাউন্ডারির বাইরে এসে হতাশভাবে বসে পড়ে। বল্টু খেঁকিয়ে ওঠে, “একটা চারও মারতে পারিস না!”
“তুই থাকলে দেখতাম কত দম।”
“দম আর দেখতে হবে না। তুই বরং গাঁজায় দম দে। একটা লোপ্পা বল কভার ড্রাইভ করলেই হয়ে যায়...
“ফালতু কথা, বলবি না বল্টু। তুই গাঁজা টান।”
“তুই গাঁজাখোর...
দুজনের মধ্যে বচসা যখন তুঙ্গে তখন শঙ্খদা দুজনের পিছনে এসে বসে পড়ে, “আ!চুপ কর।খেলা তো শেষ। তোরা যা শুরু করেছিস, তাতে দেখি পাখিদের মতো গাঁজা টেনে সাতমহলা বানিয়ে ফেলবি তোরা!”
পিকাই আর বল্টু প্রায় একসঙ্গে বলে ওঠে, “পাখিরা গাঁজা খায়? আগে জানতাম না তো। একটা কেমন গল্প-গল্প গন্ধ পাচ্ছি।”
“অন্যপাখিরা খায় কিনা জানি না। তবে কলকাতার পাখিরা খেত!”
“খেত?” পিকাই মাথা চুলকায়। “শঙ্খদা, বলবে যখন খুলেই বলো না বাপু!”
শঙ্খদা স্বভাবসিদ্ধভঙ্গিতে এক পা ঘাসের উপরে লম্বা করে দিয়ে পাশে দুইহাতে ভর দিয়ে গল্প বলা শুরু করে।
সময়টা একেবারে উনবিংশ শতকের গোড়ার দিকের। ধরে নিতে পারিস ঐ মোটামুটি ১৭৯০ এর পর বা মোটামুটি ঐ রকম সময়ে। তখন কলকাতার বাবু গোছের ভদ্রসন্তানদের বাইজি বাড়ি থেকে সোনাগাছি যাওয়ার বেশ চল ছিল। তবে সেই অর্থে এঁদের বেশির ভাগেরই নেশা ছিল গাঁজার। বাগবাজার, বটতলা আর বউবাজার এই তিনটে ঠেক সেই সময় গাঁজার নেশা করার জন্য বিখ্যাত ছিল। রীতিমতো ক্লাব ঘরের মতো বানিয়ে সেখানে কলকাতার ভদ্রসন্তানরা অবধি গাঁজা টেনে পড়ে থাকত। গাঁজা টানতে টানতেই সম্ভবত তাঁরা আবিষ্কার করেছিলেন যে তাঁরা বুঝি পাখির মতো উড়তে পারেন। আর তাই কলকাতার বুকে তৈরি হল পক্ষীসমাজ। এঁরা শুধু নামে পক্ষী ছিল না, এক এক জন এক এক পাখির বেশভূষা পরে হাটে-বাজারে ঘুরতও বটে। বাগবাজারের পক্ষীদল এর মধ্যে সুপ্রসিদ্ধ ছিল কারণ এই ঠেকে তৎকালীন গুণী গায়ক রামনিধি গুপ্ত অবধি আসতেন।
“রামনিধি গুপ্ত মানে নিধুবাবু যিনি কিনা ‘নিধুবাবুর টপ্পা’র জন্য বিখ্যাত?”
.
.
.
পিকাই জিজ্ঞাসা করে ওঠে, “এই যে তুমি বললে, গাঁজা খেয়ে সাতমহলা বানিয়ে ফেলার কথা, সেটারও কী কোনও অর্থ আছে? নাকি এমনিই?”
শঙ্খদা কপালে হাত ঠুকে বলল, “ও! ওটা বলতেই ভুলে গিয়েছি। দলে পক্ষী অনেক থাকলেও ‘পক্ষীরাজ’ কিন্তু সবাই ছিল না। যে ব্যক্তি একাসনে বসে একশো আট ছিলিম গাঁজা টানতে পারত, তাঁরা একটা করে ইঁট পেত। উপহার বা পুরস্কার বলতে পারিস। বা স্মারক। সেই ইট জমিয়ে যিনি একটা গোটা বাড়ি বানাতে পারতেন তিনিই পেতেন ‘পক্ষীরাজ’ উপাধি। কলকাতার ইতিহাসে এরকম পক্ষীরাজ ছিলেন দেড়জন। এক্ষুনি যে পটলডাঙ্গার রূপচাঁদ দাসের নাম করলাম তিনি ছিলেন একজন ‘পক্ষীরাজ’। তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘রূপচাঁদ পক্ষী’।
.
.
.
পিকাই অধৈর্য হয়ে পড়ে, “তুমি বললে দেড় জন পক্ষীরাজ ছিল। তাহলে বাকি অর্ধেকের কী কেস?”
স্ক্রিপ্ট- কৌশিক রায় | কণ্ঠ - শঙ্খ বিশ্বাস | সাউন্ড ডিজাইন- শঙ্খ বিশ্বাস
এক সময়ের সমৃদ্ধ নগরী ছিল কলকাতা। এই নগরের উপর দিয়েই বাণিজ্যে গিয়েছিলেন চাঁদ সওদাগর। তারপরে এক প্রবল জলোচ্ছ্বাসে ডুবে যায় এ সমৃদ্ধ নগরী। সত্যি নাকি মিথ? জানব আজকের পর্বে।
‘ইয়ে, মানে, বলছিলাম কী, কাল তো কলকাতার নামকরণ নিয়ে অনেক কিছু বললে, তো তার সঙ্গে এক্সট্রা আরও কিছু যদি—’
‘এক্সট্রা বলতে?’
‘আসলে কাল তোমার ওই বল্লাল সেন, কালীঘাট, এসব শুনে টিকি খাড়া হয়ে গিয়েছে। তাই ভাবছিলুম, কলকাতা কতটা পুরোনো, ইত্যাদি যদি জানতে পারতাম…’
‘বুঝেছি। শোন তবে!’ বলে গুছিয়ে বসল শঙ্খদা। তারপর বলতে শুরু করল।
‘চার্নক সাহেব কলকাতায় আসার আগেও যে এই কলকাতা ছিল, তার প্রমাণ আছে গুরু নানকের জীবনীতেই। গুরুমুখি ভাষায় লেখা সেই জীবনীতে পরিষ্কার বলা আছে, ১৫০৩ সালে গুরু নানক কলকাতায় এসেছিলেন।’
‘তুমি গুরুমুখী ভাষাও জানো?’ পিকাই জিজ্ঞাসা করল।
প্রশ্নটাকে ততটা পাত্তা না দিয়ে শঙ্খদা বলে চলল ‘গুরু নানক যেখানে বসে ধর্মপ্রচার করেছিলেন এবং বিশ্রাম নিয়েছিলেন, সেই জায়গাটা কালক্রমে এক জমিদারির অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৬৬৬ সালেশিখেদের নবম গুরু, গুরু তেগবাহাদুর সেই জায়গাখানা তৎকালীন জমিদারের থেকে কিনে নেয়। তারপর সেখানে তিনি বড়া শিখ সঙ্গত গুরুদ্বারা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।’
‘আরিব্বাস! এটা এখনও আছে?’
‘থাকবে না কেন। এম. জি. রোড আর চিৎপুর রোডের মোড়ের কাছে চলে যা। ওখানে যে গুরুদ্বারাটা আছে, সেটার কথাই বলছি।’
‘কলকাতায় গুরু নানক! ভাবতে পারছিস?’ বল্টু আর পিকাই নিজেদের মধ্যে ফিসফাস করতে লাগল।
‘আরও আছে,’ বলে শঙ্খদা আবার বলতে লাগল, ‘শোনা যায়, একসময় কলকাতা নদীয়া জেলার অংশ ছিল। অত্যন্ত জলা জায়গা ছিল এটা। সেই জলাজমির গ্রামে কয়েকঘর চাষি আর জেলে বাস করত। ১৬৯০ সালে জোব চার্নক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কুঠি স্থাপন করার সনদ পান। তারপর ১৬৯৮ সালে আওরংজেবের নাতি আজিম-উন-শাহে থেকে তিনটি গ্রাম কেনার অনুমতি নেন। তার রেঞ্জের গল্প তো আগেই বলেছি। মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ!’
‘গুড। মোটামুটি পনেরোশ’ শতক থেকে কলকাতার উল্লেখ ইতিহাসের পাতায় পাওয়া গেলেও তারও আগে কলকাতার নামের উল্লেখ আছে। তাও আবার লিটারেচারে।’
‘তাই নাকি? কোথায়?’
‘চাঁদ সদাগরের নাম শুনেছিস?’
‘ওই বেহুলা-লখিন্দরের গপ্পো তো? মনসামঙ্গল?’
‘হ্যাঁ। কার লেখা জানিস?’
‘না।’
‘বিপ্রদাস পিপলাই। অবশ্য একা ইনিই রচনাকার নন। অনেকেই মনসামঙ্গল লিখেছিলেন। তবে তার মধ্যে কানা হরিদাস, বিজয়গুপ্ত, নারায়ণদেব, আর বিপ্রদাস পিপলাই-ই সবচেয়ে ফেমাস। একেকজনের ভার্সন একেকরকম, নানারকম লেখার স্টাইল। বিপ্রদাসের মনসামঙ্গল লেখা হয় ১৪৯৫ সালে। একমাত্র এই মনসামঙ্গলেই সন-তারিখের একটা ঠিকঠাক হিসেব পাওয়া যায়। সেখানে চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যযাত্রা বর্ণনায় কলকাতা কেন, কলকাতার আশেপাশের অনেক জায়গার নামই সেখানে আছে। দাঁড়া, বইখানার কপি বের করি।’
ল্যাপটপটা টেনে নিয়ে কী যেন খুটখাট করে শঙ্খদা একটা পিডিএফ বের করে ফেলল। তারপর পড়তে লাগল:
ডাহিনে হুগলি রহে বামে ভাটপাড়া
পশ্চিমে বাহিল বোয়ো পূর্বে কাঁকিনাড়া।
মূলাজোড় গাড়ুলিয়া বাহিল সত্ত্বর
পশ্চিমে পাইকপাড়া বাহে ভদ্রেশ্বর।
চাঁপদানি ডাহিনে বামেতে ইছাপুর
বাহ বাহ বলি রাজা ডাকিছে প্রচুর।
বামে বাঁকিবাজার বাহিয়া যার রঙ্গে
জমিন বাহিয়া রাজা প্রবেশে দিগঙ্গে।
পূজিল নিমাইতীর্থ করিয়া উত্তম
নিমগাছে দেখে জবা অতি অনুপম।
চানক বাহিয়া যায় বুড়নিয়ার দেশ
তাহার মেলান বাহে আকনা মাহেশ।
খড়দহে শ্রীপাট করিয়া দণ্ডবত
বাহ বাহ বলি রাজা ডাকে অবিরত।
রিসিড়া ডাহিনে বাহে বামে সুকচর
পশ্চিমে হরিষে রাজা বাহে কোননগর।
ডাহিনে কোতরং বাহে কামারহাটী বামে
পূর্বেতে আঁড়িয়াদহ ঘুসুড়ি পশ্চিমে।
চিতপুরে পূজা রাজা সর্বমঙ্গলা
নিশিদিসি বাহে ডিঙ্গা নাহি করে হেলা।
পূর্বকূল বাহিয়া এড়ায় কলিকাতা
বেতড়ে চাপায় ডিঙ্গা চাঁদো মহারথা।
‘কী বুঝলি?’ পড়া শেষ হতে শঙ্খদা প্রশ্ন করে।
‘উরি বাপ রে বাপ রে বাপ! এ সব নামই তো চেনা!’
আধবোজা চোখে মাথাটা একটু নাড়িয়ে শঙ্খদা বলল, ‘হুঁ হু! বলেছিলাম। যাই হোক, লিটারেচারের কথা যখন উঠলই, তাহলে আরও কয়েকটার কথা বলতে হয়।
চার্নকসাহেবের ওপর কলকাতা খোঁজার দায়িত্ব পড়েনি। তাঁর ওপর দায়িত্ব পড়েছিল তৎকালীন বেঙ্গলে, অর্থাৎ বাংলায় এমন একটা শহর খোঁজার, যেখানে ইংরেজরা এসে বসতি স্থাপন করতে পারে, ব্যবসা বাণিজ্য বিস্তার করতে পারে। সেই কাজে বেরিয়ে চার্নকসায়েব ১৬৫৫ সালে ভারতে আসেন। বাংলায় ঢুকে তিনি প্রথমে বসতি স্থাপনের জন্য নির্বাচন করেছিলেন উলুবেড়িয়াকে।
চার্নকসাহেব যা যা চাইছিলেন, তার সবই মিলে গিয়েছল, কিন্তু বাদ সেধেছিল মশা। সেখানে এতই মশার উৎপাত যে তাঁরই টেকা দায়। একটা মানুষকে পেলে মশারা যদি এমন অত্যাচার শুরু করে, তাহলে একটা গোটা কলোনি পেলে কী করবে ভেবে নে। অগত্যা মশার কামড় খেতে খেতে চার্নকসাহেব সব সুবিধা-অসুবিধা জানিয়ে উলুবেড়িয়া থেকেই চিঠি লিখলেন ওপরমহলকে। যখন অন্য জায়গা খোঁজার নির্দেশ এল, তখন যেন উনি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন। তারপর উনি ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়েন আমাদের কলকাতায়। কলকাতা তখন গ্রাম। তিনটে গ্রাম ইজারা নিয়ে তৈরি হল শহর। কী কী গ্রাম বল দেখি?’
‘ওই তো, কলিকাতা, সুতানুটি, আর গোবিন্দপুর।’
‘ভেরি গুড। বর্তমান ময়দান চত্বর, মানে ধর্মতলা থেকে এখনকার এক্সাইড চত্বর অবধি গোবিন্দপুর। কলিকাতা গ্রামের আবার দুটো ভাগ। ডিহি কলকাতা আর পরগণা কলকাতা। ডিহি কলকাতার শুরু ধর্মতলা থেকে, শেষ বড়বাজারে। আমাদের কলেজ স্ট্রিট, শিয়ালদা সব এর মধ্যে রয়েছে। জোড়াসাঁকোর ঠিক আগে অবধি ডিহি কলকাতার সীমানা। জোড়াসাঁকো থেকে শুরু করে শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড় অবধি সুতানুটি। রইল বাকি পরগণা কলকাতা। এটা হচ্ছে বরানগর থেকে বেলঘরিয়া অঞ্চল অবধি। অ্যাদ্দিন কলিকাতা বলতে একটাই গ্রাম বুঝতিস, কিন্তু এটা নতুন জানলি নিশ্চয়ই? তবে একটা ব্যাপার আছে। এই তিনখানা গ্রামের মধ্যে থেকে কলিকাতাকেই কেন নগরের নামের জন্য বেছে নেওয়া হল, তা সঠিক জানা যায় না। তবে কিছু ধারণা পাওয়া যায়। যাক বাদ দে সে কথা। ওটা অন্য কোনওদিন ভাবা যাবে।
যাকগে, যা বলছিলাম। চার্নকসাহেব যখন নতুন নগরীর সনদ পেয়ে এলেন, তখন শহরের অধিষ্ঠাত্রী দেবীর বাসস্থান অনুসারে নাকি নাম দিয়েছিলেন “কালীকোঠা” অর্থাৎ, কালী দেবীর বাসস্থান”। সেই কালীকোঠা থেকে অপভ্রংশ হয়েই কলিকাতার সৃষ্টি।’
‘আরিব্বাস! কালীঘাট এত পুরোনো!’
‘হুঁ হুঁ বাবা! এমনি এমনি কি আর সতীপীঠ? তবে বাইবেলের সঙ্গেও কলকাতার নামকরণের সম্পর্ক আছে, জানিস?’
‘বোঝো! বলো!’
‘কলকাতা নগর স্থাপনের নানা রোগজারি লেগেই ছিল। সেসবের জন্য বহু মানুষ মারা যেত। তখন চিকিৎসাও এত উন্নত হয়নি। যে রোগ এখন তিনদিন ওষুধ খেলে সেরে যায়, সেই রোগেই তখন মানুষ মারা পড়ত। সেসব মৃতদেহ সৎকার করবে কী করে? হয় নদীর ধারে ফেলে যেত, নাহলে জলে ভাসিয়ে দিত।
স্ক্রিপ্ট - দীপ্তজিৎ মিশ্র
কণ্ঠ- শঙ্খ বিশ্বাস
সাউন্ড ডিজাইন - শঙ্খ বিশ্বাস
নতুন বছর। নতুন দিন। নতুন করে শুরু হোক সব কিছু। পুরানো বছরে অনেক কিছুই হয়তো হল না, আমরা ব্যর্থ হলাম। হোক না। আবার করে শুরু করতে কী অসুবিধা? চারপাশে অনেক মানুষকেই দেখি যাঁরা বয়সের কারণে নতুন কিছু শুরু করতে ভয় পান। ব্যর্থ হলে কী হবে? লোকে কী বলবে? এসব সরিয়ে রেখে বরং ভাবুন যা আপনি করতে চাইছেন, তার অর্ধেকও যদি আপনি করতে পারেন, তাহলে আপনি ঠিক কতটা খুশি হবেন! হয়তো আপনার নিজের অজান্তেই অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবেন অন্য কারও। কি বিশ্বাস হল না? তাহলে নতুন বছরের সকালে একটা পুরানো গল্প শোনাই।
.
এই ঘটনার পঞ্চাশ বছর পরে ১৯৮২ সালে ভারতীয় বিমান পরিসেবার পঞ্চাশ বছর পূর্তির উদযাপন হচ্ছে সারা দেশে। JRD Tata-এর বয়স তখন ৭৮ বছর। এই উদযাপনের পূর্তি উপলক্ষে তিনি আবার একবার শেষবারের জন্য বিমান চালাতে চাইলেন। এই বয়সে বোর্ড অফ ডিরেক্টরস্রা কোনও মতেই তাঁর এই প্রস্তাবে সম্মত হতে পারলেন না। তিনি নিয়মমাফিক ডাক্তারি পরীক্ষা দিয়ে, প্রমাণ করে দিলেন দৈহিক ও মানসিক দুইভাবেই তিনি এখনও যাত্রীবাহী বিমান চালানোর জন্য সক্ষম। অবশেষে তাই একপ্রকার নিমরাজি হলেন সবাই। নির্ধারিত দিনের তিন সপ্তাহ আগে তাঁর একটি ছোট মাপের হার্ট অ্যাটাকও হল। তাঁর হৃদ বিশেষজ্ঞ প্রথমদিকে রাজি না থাকলেও পরে বুঝলেন, JRD Tata তাঁর এই শেষ স্বপ্নের জন্য বিমানের ককপিটেও প্রাণত্যাগ করতে রাজি আছেন।
স্ক্রিপ্ট - কৌশিক রায়
কণ্ঠ- শঙ্খ বিশ্বাস
সাউণ্ড ডিজাইন- শঙ্খ বিশ্বাস
কালকাতায় প্রথম গির্জা তৈরি করেছিল আর্মেনিয়রা। ইংরেজরা যখন কলকাতা আসে তখন তাঁরা সেই গির্জাই ব্যবহার করত। এরমধ্যে জব চার্ণক পাকাপাকি কলকাতা বসবাস শুরু করলে তাঁর মনে হয় এ পোড়া দেশে উৎসব তো কিছু নেই, তাই শুরু করলেন বড়দিন পালন। মজার ব্যাপার হল এই বড়দিন প্রভু যিশুর জন্মদিন হিসাবে পালিত হলেও ২০০ খ্রিস্টাব্দ অবধি খ্রিস্টান ক্যালেন্ডারে এরকম কোনও উৎসবের দিন ছিলই না। ৪০০ খ্রিস্টাব্দে পোপ তথা ধর্মগুরুরা ২৫শে ডিসেম্বর বড়দিন পালনের কথা ঘোষণা করলেন। ইংরেজদের তৈরি চার্চ একসময় ভেঙে দিয়েছিলেন নবাব সিরাজ। আরও পরে স্থানাভাব দেখা দিলে শুরু হয় সেন্ট পল ক্যাথিড্রাল। এরকম আরও অনেক অজানা গল্প নিয়ে থাকছে এই পর্ব।
সাউন্ড ডিজাইন- শঙ্খ বিশ্বাস।
ভাষ্য- কৌশিক রায়
চারশো বছর পুরানো চার্চ। বাংলার প্রথম চার্চ। খোদ সম্রাট শাহজাহান যে চার্চ ভেঙে দিয়েছিলেন, তা গড়ার জন্য পরে নিজেই ৭৭৭ একর জমি দিয়েছিলেন। কেন? কোন গির্জা? গল্প হবে আজকের পর্বে। ভাস্কো দা গামা ভারতে পা রাখার পর থেকে সবকটা সমৃদ্ধ বন্দর নগরীতেই পোর্তুগিজরা অধিকার লাভের চেষ্টা করে যাচ্ছিল। এভাবেই পোর্তুগিজরা ১৫৩৪ সালে চট্টগ্রামে এসে পৌঁছাল এবং সেখানেই তাঁরা বাণিজ্য শুরু করে। কিন্তু পোর্তুগিজদের দুর্ব্যবহারের কারণে তৎকালীন বাংলার শাসক মহম্মদ শাহ তাঁদের গ্রেফতার করেন। একই বছর শের শা সুরি বাংলা আক্রমণ করে মহম্মদ শাহকে কোণঠাসা করে ফেলেন। মহম্মদ শাহ বুঝলেন শের শাকে রুখতে হলে তাঁকে পোর্তুগিজদের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে। তিনি তাই করলেনও, পোর্তুগিজরাও এতে রাজি হল, কারণ তা তাদের জন্য বাংলায় ব্যবসার দ্বার অনেকটা উন্মুক্ত করে দেয়। ১৫৩৭ সালে অ্যাডমিরাল সাম্পোয়া মহম্মদ শাহকে যুদ্ধে সহায়তা দান করে শের শাকে পরাস্ত করেছিলেন। এই যুদ্ধ জয়ের পুরস্কার হিসাবে পোর্তুগিজরা গঙ্গার তীরে কুঠি গড়ার অধিকার পেল। ধীরে ধীরে মোগল বাদশাদের সঙ্গেও সখ্যতা বাড়াচ্ছিল পোর্তুগিজরা, কারণ তারা বাংলা ও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে পোর্তুগিজ কলোনি স্থাপনের জন্য জমির খোঁজ করছিল। ১৫৭১ সালে আকবর হুগলীতে পোর্তুগিজদের একটি শহর স্থাপনের অনুমতি দিলেন। প্রথমে ১৫৭৯ সালে বাণিজ্যকুঠি পরে তা রক্ষার জন্য দূর্গ নির্মাণ করল তারা। তৎকালীন দুর্গপ্রধান পেড্রো তাভারেস বন জঙ্গল সাফ করে বসালেন নতুন শহর। নাম উগোলিম । ইংলিশে আগলি। সেই নাম অপভ্রংশ হতে হতে শেষ অবধি এখন কী হয়েছে?
Script: Kaushik Roy
Voice: Sankha Biswas
Sound Design: Sankha Biswas
How the name of the city becomes 'Kolkata'/'Calcutta'?
কত পুরানো শহর কলকাতা, তা নিয়ে আছে নানা তর্কবিতর্ক। কীভাবে হল তাঁর নাম কলকাতা বা ক্যালকাতা তা নিয়েও আছে তর্ক। তাই আজকের পর্বে আমরা সেরকমই কিছু তর্ক বিতর্কের গল্প বলব খুব তাড়াতাড়ি। আজ থাকল ছোট্ট ঝলক।
From the publisher's feed