রাজভূমি রাজস্থান। এই রাজ্যের পশ্চিমপ্রান্তে বিছিয়ে রয়েছে থর মরুভূমি। রুক্ষ প্রকৃতিও যে কতটা রাজকীয় হতে পারে তা রাজস্থানের মরুভূমিতে না গেলে বোঝাই যাবে না। সোনালি বালির ঢেউ ওঠে রাজ্যের মরু শহরগুলোয়। সেই বালির গায়ে যখন সূর্যকিরণ ছড়িয়ে পড়ে তখন মনে হয় সোনার পাতে ঘেরা রয়েছে গোটা প্রান্তর।
সেই মরুপ্রকৃতির গা ছোঁয়া দুই মরুশহর জয়সলমীর আর বিকানির। এখানে লোকজনের জীবন রঙিন। উজ্জ্বল রঙের পোশাক থেকে সাজগোজ ঘিরে রেখেছে এখানকার মানুষকে। তাঁরা নিজেরাও যেমন উজ্জ্বল থাকেন তেমনই পোষ্যদেরও রঙিন রাখতে পছন্দ করেন। আর সেই রঙের অনুভবে মন রাঙিয়ে নিতে চাইলে চলুন দুটো উৎসবের আঙিনায় একটু ঘুরে আসি। শীতের মরশুমে জয়সলমীর আর বিকানির মেতে ওঠে উৎসবের আনন্দে। আগেই বললাম, রাজস্থানের উৎসব মানেই রঙের ঝলমলে পরিবেশ। এছাড়াও রয়েছে মনমাতানো লোকসংস্কৃতির উদযাপন।
রাজস্থানের মেলা ও উৎসবগুলোর মধ্যে যে দু’টি উৎসব বিশেষ উল্লেখের দাবি রাখে জয়সলমীরের মরু উৎসব তারই অন্যতম। আগামী ২২ থেকে ২৪ ফেব্রুয়ারি এই তিন দিন জয়সলমীরের শহর আর থর মরুভূমির বালিয়াড়িতে বসবে এই উৎসবের আসর। সেই সময় দেশ-বিদেশের পর্যটকদের ভিড় নামে জয়সলমীরে। বিদেশিরা ভারতীয় লোকসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে এই উৎসবে শামিল হন।
উৎসবের সূচনা হয় শোভাযাত্রার মাধ্যমে। গাদিসর হ্রদ থেকে শুরু হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা।শোভাযাত্রায় অংশ নেয় সুসজ্জিত উটের দল, লোকশিল্পী, ব্যান্ডপার্টি, নানা ধরনের সাজানো ট্যাবলো সবই দেখতে পাবেন এই শোভাযাত্রায়। দুর্গ, পুরনো শহর ঘুরে সেই বিশাল শোভাযাত্রা এসে পৌঁছয় পুনম স্টেডিয়ামে।এটিই মূল উৎসব প্রাঙ্গণ।
এই স্টেডিয়ামে উৎসবের দিনে সকালে ও সন্ধেবেলায় অনুষ্ঠিত হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নানা ধরনের প্রতিযোগিতারও আয়োজন করা হয়। সেইসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেন আঞ্চলিক মহিলা ও পুরুষরা। লোকসংস্কৃতির ছোঁয়ায় বিভিন্ন যুগের টুকরো টুকরো চিত্র জীবন্ত হয়ে ওঠে এই প্রতিযোগিতাগুলোর মাধ্যমে। প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত গ্রামের মহিলাদের জীবনের প্রতিচ্ছবিও বলা চলে একে।
এছাড়া কিছু মজার খেলাও থাকে। যার মধ্যে টাগ অব ওয়ার উল্লেখযোগ্য।আর আছে উটের দৌড়। সে এক দেখার মতো প্রতিযোগিতাই বটে। নিজের উটটিকে রাজকীয় বেশে সাজিয়ে তোলেন উটের মালিক। মাথায় মুকুট, পায়ে নূপুর কোনও কিছুই বাদ যায় না সাজ থেকে। পিঠের হাওদাখানাও নতুন ভেলভেট আর কাচের মোড়কে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। উটের দৌড়ে হার জিত তো রয়েইছে কিন্তু সাজগোজের বহরও দেখার মতো।
এরপর হল ডেজার্ট ফ্যাশন শো। সেও এক দেখার মতো জিনিস। মরুশহরের সাজ কিন্তু একেবারেই ভিন্নরকম। রাজস্থানী চুনরি প্রিন্টের শাড়ি, জয়পুরি কাজ করা শাড়ি, জরির ঝালর বসানো আঁচল, আয়না লাগানো পাড় তো রয়েছেই, সঙ্গে পাবেন নানারকম আদিবাসী গয়নার ঝলক।ঘোমটা টানা শাড়ির স্টাইল, কানের বালি, ঝুমকো ইত্যাদিও দেখার মতো।সেখানে বিক্রি হয় রাজস্থানের দুর্দান্ত সব হস্তশিল্প সামগ্রী। লাগোয়া মরুগ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ। খুরি, দামোদরা, কালোই প্রভৃতি মরুগ্রাম থেকে রঙিন পোশাকে সজ্জিত মানুষজন ভিড় জমায় এই উৎসবের আসরে।
উৎসব উপলক্ষ্যে আলোয় সেজে ওঠে সোনার কেল্লা, হাভেলি, প্রাসাদ, মহল্লা। প্রতিদিন সন্ধেবেলা নানা জায়গায় বসে পুতুল নাচের আসর। মরু উৎসবের শেষ দিনটা সবথেকে আকর্ষক। এদিন সমাপ্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় থর মরুভূমির স্যাম বালিয়াড়িতে। বালির বুকে মঞ্চ বেঁধে অনুষ্ঠিত হয় অনবদ্য লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠান। সবশেষে আতসবাজির খেলা। চাঁদনি রাতে হিমশীতল মরুভূমির আকাশে ঝরে পড়ে রংবেরঙের আগুনের ফোয়ারা। মরু উৎসব দেখতে এসে একযাত্রায় শহরটাও ঘুরে নিন। জয়সলমীরে দেখবেন বিখ্যাত দুর্গ-সোনার কেল্লা, পাটোয়া হাভেলি, নাথমল হাভেলি, সেলিম সিং হাভেলি, ব্যাসছত্রি, গাদিসর হ্রদ, তাজিয়া টাওয়ার, লোধুরবা জৈন মন্দির, খুরি বালিয়াড়ি, স্যাম বালিয়াড়ি প্রভৃতি।
উৎসবের প্রথম দিন সকালে জুনাগড় দুর্গের সামনে থেকে শুরু হয় বিরাট শোভাযাত্রা। নানা সাজে সাজানো উট, রাজস্থানি লোকশিল্পীর দল, রাজপরিবারের অশ্বারোহী বাহিনি, সুসজ্জিত পাইক-পেয়াদা, ব্যান্ড পার্টি। ঐতিহ্যময় পোশাকে সেজে স্থানীয় মানুষজন, সুসজ্জিত ফিটন গাড়িতে চেপে বিদেশি পর্যটকরা ভিড় জমায় এই শোভাযাত্রায়। শহরের পথে পথে ঘুরে শোভাযাত্রা পৌঁছয় করণি সিং স্টেডিয়ামে। এখানেই অনুষ্ঠিত হয় উদ্বোধনী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিদিন এখানেই সন্ধেবেলা অনুষ্ঠিত হয় নানা ধরনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। আর দিনের বেলায় অনুষ্ঠিত হয় শ্রেষ্ঠ বিকানির সুন্দরী, শ্রেষ্ঠ মাড়োয়ার পুরুষ, উটের দৌড়, শ্রেষ্ঠ সাজানো উট, উটের নাচ, উট নিয়ে সেনা জওয়ানদের কসরত প্রভৃতি প্রতিযোগিতা। গ্রামে উৎসবের দিনটাও বেশ আকর্ষক। সেখানে গ্রাম্য খেলাধুলো ছাড়াও রাজস্থানি লোকসংস্কৃতির অনুষ্ঠানও হয়। উৎসবের সমাপ্তি হয় চোখ ধাঁধানো আতসবাজির রোশনাইয়ে
বিশেষ কৃতজ্ঞতা: বর্তমান পত্রিকা।