মধ্যপ্রদেশ থেকে ফিরছিলেন সাধক রামপ্রসাদ সেন। ত্রিবেণী পার করে হালিশহর যাওয়ার কথা। ত্রিবেণীর মাইলখানেক আগে মগরার কাছে গহীন অরণ্যে বিধু ও রঘু ডাকাতের হাতে ধরা পড়লেন। তাঁর কাছে মূল্যবান তেমন কিছু না ছিল না। কালীর সামনে রামপ্রসাদকে বলি দেবে বলে ঠিক করে ডাকাতরা। হাড়িকাঠে মাথা দেওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে কালীর চরণে গান নিবেদনের ইচ্ছাপ্রকাশ করেন সাধক। গান ধরলেন- ‘তিলেক দাঁড়া ওরে সমন/বদন ভরে মাকে ডাকি/বিপদ কালে ব্রহ্মময়ী/আসেন কি না আসেন দেখি।’ গান শুরুর খানিক্ষণের মধ্যে ভাবে বিহ্বল হয়ে পড়ে দুর্ধর্ষ ডাকাতরা। কথিত, রামপ্রসাদের মুখাবয়বের মধ্যে কালীর ছবি ফুটে উঠেছিল। ধীরে গোটা অবয়বজুড়ে কালীর রূপ। এই অলৌকিক ঘটনার দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে ডাকাতরা। অনুশোচনায় বিদ্ধ হয়ে রামপ্রসাদকে তো বটেই নরবলি প্রথাই চিরতরে বন্ধ করে দেয়। শোনা যায়, আজও নিশুতি রাতে মন্দির লাগোয়া পুকুর ঘাটের দরজা খুলে রাখতে হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, চাতালে বসে গায়ে জল ছিটিয়ে স্নান করেন রঘু ডাকাতের কালী।
ত্রিবেণী তখন গভীর অরণ্যে ঢাকা। জঙ্গলে বাঘের উৎপাত। রঘু ঘোষ ও বিধুভূষণ ঘোষ নামে দুই ডাকাতের রাজত্ব। তাঁরা স্বপ্নে কালীকে দেখেন। স্বপ্নে পাওয়া চেহারা অনুযায়ী তৈরি করিয়েছিলেন মূর্তি। সে মূর্তি ভয়ঙ্কর। ডাকাতরা মাতৃরূপে জ্ঞান করতেন কালীকে। ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মাকে স্নান করিয়ে পুজো দিতেন। ডাকাতি শেষেও পুজো হতো। তখনই চালু হয়েছিল নরবলি প্রথা। মন্দিরের সেবাইত সুমন চক্রবর্তী বলেন, ‘ওই ঘটনার পর নরবলি বন্ধ হলে শনিবার, মঙ্গলবার ও অমবস্যায় ছাগ বলি হয়। তা এখনও চালু। এখন স্থায়ী মন্দিরে নিত্য পুজো হয়। কালী পুজোর দিন বিশেষ পুজো। সেদিন ভোরে কালীকে জাগিয়ে স্নান করিয়ে ভোগ নিবেদন হয়। সকাল আটটা থেকে শুরু হয় ভক্তদের পুজো দেওয়া। দুপুর একটা নাগাদ খিচুড়ি, পাঁচ রকম ভাজা, একাধিক তরকারি দিয়ে ভোগ। তারপর দুটো থেকে ফের ভক্তদের জন্য মন্দির খুলে দেওয়া হয়। রাত ১১টা থেকে মন্দির বন্ধ করে শুরু হয় নিশি পুজো।’ তিনি জানালেন, বলির পাঁঠার মাংসের মহাভোগ সরায় করে কাঁচা অবস্থায় দেওয়ার রীতি। ওই সরাতে থাকে পান, সুপারি, কলা ও মিষ্টি। রাতে দেওয়া হয় লুচি, খিচুড়ি, নাড়ু, পায়েস, পাঁচ রকম ভাজা, চচ্চড়ি, ফুলকপি ও বাঁধাকপির সব্জি ও অন্যান্য তরকারি। এছাড়া কাতলা মাছের ঝাল, রুই মাছ ভাজা, চাটনি থাকে। ওই ভোগেই ল্যাটা মাছ পোড়া দেওয়ার রীতি। ল্যাটা মাছ এখানকার মহাপ্রসাদ। একবার ল্যাঠা না পাওয়ায় শোল মাছ পোড়া দেওয়ার প্রস্তুতি হয়েছিল। ভোগ দাখিলের আগের মুহূর্তে আচমকা এক জেলে এসে ভোগ নিয়ে যেতে বারণ করে। মাঝরাতে একপাটা জাল ফেলে মন্দির লাগোয়া পুকুর থেকে একটি ল্যাঠা মাছ ধরে দেন তিনি। ভক্তরা এখনও রাতভর ওই প্রসাদ পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করেন। সবার বিশ্বাস, এই কালীকে ভক্তিভরে ডাকলে তিনি কাউকে নিরাশ করেন না।